শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে তালা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ২লাখ টাকার চেক প্রদান নলতায় সাবেক সেনাসদস্য নুরুল ইসলাম কর্র্তৃক জমি দখল হয়রানির অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থার সৃষ্টি বিষয়ক কর্মশালা মিসেস ইলা হকের মৃত্যুতে স্বপ্নসিঁড়ি’র শোক প্রকাশ প্রবেশ নিষিদ্ধকালে অবৈধভাবে মাছ ধরার সময় সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৬ জেলে আটক তালায় অসহায় দিন মজুরের বাড়ীঘর ভাংচুরের অভিযোগ তালায় পানি কমিটির ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত তালায় গলায় রশি দিয়ে এক বৃদ্ধ’র আত্নহত্যা সম্মেলনের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা যুবদলের কমিটি গঠনের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন বাতিল হচ্ছে পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা

শ্যামনগরের আক্তার হোসেন এক অনাবিস্কৃত প্রতিভা

 শেখ নাজমুল হাসান, শ্যামনগর

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৪:৫২
  • ২২৮
‘আকতার হোসেন’ একজন অনাবিস্কৃত প্রতিভা। শুধু প্রতিভা বললে তো ভুল বলা হবে।  নিজের শীর্ষদের কাছে আক্তার হোসেন একজন তারকা।  ‘আক্তার ওস্তাদ’ নামেও খ্যাত সে। আলোচনার আড়ালে থেকে ফুটবলের জন্য অবিরত সংগ্রাম করে চলা এই যুবকের নাম মোঃ আক্তার হোসেন।
শ্যামনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের হায়বাতপুর গ্রামের সুন্দর সরদার ও  ছফুরা খাতুনের কোল আলো করে ১৯৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করে আক্তার হোসেন। দারিদ্র্যতার সাথে সংগ্রাম করে পিতা সুন্দর সরদার অতি কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু মাত্র ছয় বছর বয়সে ১৯৮৯ সালে পিতাকে হারিয়ে পিতৃশোকে কাতর হয়ে পড়েন আকতার হোসেন। শৈশবের গন্ডি না পেরুতেই পিতা হারানোর এমন বেদনা চরম ভাবে মর্মাহত করে তাকে।

একদিকে দারিদ্রের কষাঘাত অন্যদিকে অন্যদিকে একমাত্র পুত্র আকতার হোসেনের লালন পালনের দায়িত্ব চরম ভাবে হাঁফিয়ে তোলে আক্তার হোসেনের মা ছফুরা খাতুনকে। অবশেষে পুত্র আকতার হোসেনকে নিয়ে নিজ পিত্রালয়ে বসবাস শুরু করেন ছফুরা খাতুন। এরই মধ্যে একটু একটু করে বড় হতে থাকে আকতার। শৈশবের দূরন্তপনাও বাড়তে থাকে, পাড়ার পথে প্রান্তরে, মাঠ আর খালে দাপিয়ে বেড়াতে থাকে সে। হৈ হুল্লোড়, মাঠে ডিগবাজি আর পাড়ার ছেলেরা মিলে ফুটবল নিয়ে মাতোয়ারা থাকতো সে।  এভাবেই ফুটবলের প্রতি প্রেম আসে তার। মাত্র ৯ বছর বয়সে আকতার হোসেনের ফুটবল প্রেম চুড়ান্ত রূপ লাভ করে। তৎকালিন ১৯৯১ সালে নকিপুর হরিচরন সৃতি সংঘের হয়ে গোলকিফার হিসাবে দলে অন্তরভুক্তির মধ্যে দিয়ে।
হরিচরন সৃতি সংঘের খেলোয়াড় হিসেবে সুনামের সাথে চলতে থাকে তার খেলাধূলা। গোলকিফার হিসেবে দলে অন্তর্ভুক্ত হলেও মাঠের বিভিন্ন প্রন্তরে মাঠ দাপিয়ে খেলতে থাকে সে। সুনামও ছড়াতে থাকে সাথে সাথেই। দারিদ্রতার কাছে হেরে গিয়ে লেখাপড়া ছাড়তে বাধ্য হলেও ফুটবল ছাড়েনি আকতার হোসেন। ফুটবলে দারূন পারদর্শী হয়ে ওঠায় বিশাল এক সুযগ কড়ানেড়ে যায় আকতার হোসেনের জীবন থেকে। ১৯৯৬ সালে বি.কে.এস.পি.র বাছাই পর্বে সফলভাবে উর্ত্তীর্ণ হয় সে। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলার সপ্নটাও মূহুর্তেই রংধনুর সাত রঙের মতো রঙিন হয়ে ওঠে।

কিন্তু দূর্ভাগ্য! দারিদ্রতা হার মানায় তাকে। বি.কে.এস.পি.তে খেলতে হলে তখন বাছাই পর্বে উর্ত্তীর্ণ হওয়ার পর যোগদান করার আগে ফি হিসেবে এককালীন ‘দশ হাজার টাকা’ বি.কে.এস.পি.কে পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু কোন ভাবেই দশ হাজার টাকা জোগাড় করতে না পারায় হাতছাড়া হয়ে সেই মহা সুযোগটি। মূহুর্তেই সকল আনন্দ ম্লান হয়ে ধুলায় লুটোপুটি খেলতে থাকে। আক্ষেপে ভেঙে পড়ে আকতার হোসেন। যে আক্ষেপ আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। এরই মধ্যে দারিদ্রতা আরো একবার হার মানায় আকতার হোসেনকে। অর্থের অভাবে লেখাপড়া হঠাৎ থেমে যায়। সহযোগিতা পাওয়ার মতো কাউকেই কাছে পাইনি সে তখন। যাহোক জীবনের এমন কঠিন মুহূর্তেও থেমে যাইনি সে। ফুটবলকে নিয়েই সপ্ন দেখতে থাকে। নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত ভাবে চালাতে থাকে।
২০০২ সালে খুলনা ডিভিশন ফুটবল লীগে ইয়াং মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাবে মিডফিল্ডার হিসাবে অংশগ্রহণ করে। সুনামের সাথে শেষ করে সেবারের আসর। এরপর ঢাকা রামপুরা ক্রীড়াচক্রে খেলে সে। স্বপ্নটাও ডানা মেলতে থাকে। কারন বিভাগীয় লীগ ফুটবলে মিডফিল্ডার হিসেবে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিল সে। তারপর ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন। যা সেসময় খুব কম জনের পক্ষ্যে সম্ভব ছিলো। কিন্তু এবার তার সব স্বপ্নগুলো মূহুর্তেই দুমড়ে মুচড়ে ছারখার হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায় তার। পা ভাঙার সাথে সাথে মাথা ও মেরুদণ্ড সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক চোট পায়। আর শেষ হয়ে যায় তার জিবনের সব সপ্ন। তিলে তিলে মানষিক ভাবে ভেঙে পড়তে থাকে সে। কারণ পা ভাঙার সাথে সাথে তার খেলোয়াড় হওয়ার সপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
এত বড় দূর্ঘটনাযর পর তার সুস্থ হতে প্রায় চার বছর লেগে যায়। এর বছর তিনেক পর  আবারও খেলায় ফিরে সুনিপুন ভাবে খেলতে থাকে সে। সেই থেকে সে সংকল্পো করে কোর্স হওয়ার। ফুটবলের উন্নয়নে একটা একাডেমি তৈরি করে ফুটবলার তৈরির কারিগর হওয়ার। সে দেখতে চেয়েছিলেন কোন গরিবের ছেলে যেন টাকার অভাবে পিছিয়ে না পড়ে। তাদের সপ্ন যাতে ভেঙে না যায়। যেভাবে হোক তাদের এগিয়ে নিতে কাজ করবেন বলে ঠিক করেন। তার চিন্তার প্রতিফলন ঘটে ২০০১ সালে ‘শ্যামনগর ফুটবল একাডেমি’ নামে একাডেমি প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। হাটিহাটি পা পা করে বর্তমানে অনেক দূর এগিয়েছে প্রতিষ্টানটি। নিজ হাতে গড়ে তোলা ‘শ্যামনগর ফুটবল একাডেমি’।বর্তমানে শ্যামনগর তথা সাতক্ষীরা জেলার বৃহত্তর ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বশেষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে আকতার হোসেনের কাছে প্রায় ১২০০ জন ফুটবল প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
পূর্ব থেকে সর্বশেষ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তার সংগঠনের প্রায় ৫০ জন অনুর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সি ফুটবলার খুলনা বি কে এস পি তে সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব ১৯ ও অনুর্ধ্ব ১৬ জাতীয় ফুটবল দলে মোট দুইজন এই প্রতিষ্ঠানের ফুটবলার খেলা করছেন। দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্লাব গুলোতে খেলছে ১৫ জন, ঢাকা বি.কে.এস.পি.তে খেলছে ১০ জন, ভারতের মোহনবাগান ও অন্য একটি ক্লাবে খেলছেন দুইজন, এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ক্লাব ও একাডেমিতে এ প্রতিষ্ঠানের একাধিক ফুটবল এখন খেলা করছেন।এই প্রতিষ্ঠানের দুইজন ফুটবলার ইতোমধ্যে ভারতের সুব্রত কাপ খেলেছেন।দেশ বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন পর্যায়ের খেলায় অংশ নিয়ে আকতার হোসেনের শীর্ষরা অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

শ্যামনগর ফুটবল একাডেমিতে বর্তমানে প্রায় ২০ জন প্রমিলা ফুটবলারসহ মোট ১৬০ জন নিয়মিত আকতার হোসেনের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে দরিদ্র ফুটবলারদের নিজের চরম দারিদ্রতা স্বত্তেও বাড়িতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়াও তিনি বর্তমানে শ্যামনগরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চার শতাধিক ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।  জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের প্লেয়ার তৈরি করতে তার প্রচেষ্টার যেন কোন ঘাটতি নেই। একাডেমি পরিচালনার পাশাপাশি ঢাকা রামপুরা ক্রীড়াচক্রে খেলার সুযোগ আসে তার জন্য। চুক্তিও হয়ে যায়। কিন্তুু আবারও অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে।আবারও অসুস্থতা কাটিয়ে খেলায় ফেরে আকতার হোসেন সাতক্ষীরা জেলা পর্যায়ে গনমূখী সংঘের হয়ে প্রায় এক বছর জেলা প্রথম ডিভিশনে অংশগ্রহণ করেন।
নানা প্রতিকূলতা সত্বেও নিজেকে খেলার সাথে যুক্ত রাখা ও শুধু ফুটবল প্রশিক্ষণই নয় মাদকমুক্ত সমাজ গঠনসহ নানা সমাজ উন্নয়ন মূলক বিষয়কে সামনে নিয়ে আকতার হোসেন এক নিবেদিত প্রান হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। আর তার মধ্যেই তিনি তার সেই হারানো স্বপ্নকে খুঁজে পেয়েছেন। সেজন্যই হয়তো এভাবেই সারাজীবন কাজ করে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তার এই মহৎ কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে সমাজের তৃণমূলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ও ক্রীড়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ‘জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে ‘শ্যামনগর ফুটবল ও সমাজ উন্নয়ন একডেমি’। এতো কিছুর পরেও এখনো দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে চলছে তার সকল কার্যক্রম। ফুটবলার তৈরি ও সমাজ উন্নয়নের এমন একজন নিবেদিত কারিগর আড়ালেই থেকে গেলেন। তাকে আবিস্কার করে সামনে আনার মতো কাউকেই পাওয়া গেলনা আজ পর্যন্ত। এটা নিবেদিত প্রান আকতার হোসেনের কাছে চরম হতাশাজনক ছাড়া কিছু নয়।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

সংশ্লিষ্ঠ আরও খবর